সাদা কাগজ
সাদা কাগজ বিধবার সাদা শাড়ি।
সাদা কাগজ লিখে ভরে ফেলতে হবে।
বিধবার সাদা শাড়ির শোক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার কিছু নেই।
কালো কালো বালবাচ্চায় ভরে ফেলতে হবে সাদা কাগজ—
ফলে কোলাহলমুখর প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে পৃথিবী।
প্রেম, সাদা পাতা নয়।
জীবিকা
অজস্র খামের ভেতর রাশি রাশি ভাগ্যলিপি।
থরে থরে সাজানো খামের ওপর হাঁটতে হাঁটতে
বনের পাখিও ভাবে বাণিজ্যের কথা।
ডানাভাঙা টিয়া ঠোঁট দিয়ে তুলে আনে খাম।
ভাগ্য পাঠশেষে উপার্জিত টাকা দেখে
টিয়ারও মনে জাগে ব্যবসায় সফলতা।
আবার বিষণ্ন অবসাদে চোখ বুজে সে ভাবে,
টিয়াজন্মের রক্তমাংস, ডানা—
মানুষজন্মের তানানানা।
সন্তানের পাশে
বাইরে পরিতৃপ্ত নারী ঘরে ফিরে স্বামীর সঙ্গে
সঙ্গম করতে চাচ্ছে না।
স্ত্রীর অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্ভোগ ধর্ষণের পর্যায়ে পড়ে কি না,
প্রকৃতিবিরুদ্ধ কি না—
তা ভাবতে ভাবতে লোকটি
সন্তানের পাশে ঘুমিয়ে পড়েছে।
বাইরে পরিতৃপ্ত পুরুষ ঘরে ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে
সঙ্গম করতে চাচ্ছে না।
বেসরকারি কবিতা
বিয়ে করেছি বাগেরহাটে
সুন্দরবনের কাছে শরণখোলায়।
শাশুড়ি পাতে হরিণের মাংস তুলে দিয়ে বলেন—
বাঘের মতো খাও, বাঘ হও।
হিরালাল
হিরালাল আমার সহপাঠী ছিল।
মেথরের ছেলে বলে তার সঙ্গে কেউ মিশতাম না।
কুতকুতে চোখে পেছনের বেঞ্চে একা একা বসে থাকত সে।
তার মুখে কোনো দিন হাসি দেখিনি আমি।
হিরালাল যেদিন দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে প্রথম হয়ে
তৃতীয় শ্রেণিতে উঠল—
সেদিনই ওর বারোটা বাজল।
অভিভাবকরা বললেন, মেথরের ছেলের আবার লেখাপড়া!
এর একটা বিহিত করতে হবে।
সহপাঠীরা বলল, ওর গায়ে গু-মুতের গন্ধ, ওয়াক থু।
স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আমার বাবা
বৈঠক ডেকে ওকে স্কুলছাড়া করলেন।
সেই থেকে হিরালাল তার বাবা হিরিঙ্গির সঙ্গে
জগতের বর্জ্য পরিস্কারে নেমে পড়ল।
সাম্প্রদায়িক
পৃথিবীতে মানুষ আসলে বেশিদূর এগোয়নি।
মানুষ তো আজো সাম্প্রদায়িক রয়ে গেল।
আমার হিন্দু বন্ধুরা স্বপ্নে আজো শুধু কালিমূর্তি দেখে,
মুসলমান বন্ধুরা গরুর হাড্ডি দেখে।
আমি তো সবার জন্য কবিতা লিখতে লিখতে
ফতুর হয়ে গেছি—
সামাজিকেরা আমাকে একঘরে করে রেখেছে।
হত্যামুখর দিন
উল্লাসে ফেটে পড়া ছোট ছোট ছুরি
আর চাকুদের পিতা রক্তাপ্লুত নেশায় চুর,
ঝিম মেরে বসে আছে কাছেই,
তার চোখ হিলহিলে তৃপ্তিতে ঢুলুঢুলু, আঁকাবাঁকা।
এদিকে, ছুরিদা ও চাকুদা চামড়া ছাড়াতে ছাড়াতে
কী দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে
ফরফর ধ্বনি।
এইভাবে দিকে দিকে ছুরি আর চাকুদের
উৎসব আজ। আজ ঈদ।
হত্যামুখর দিন।
আহা,
নতুন পোশাকে আনন্দে মেতেছে শিশুরা।
পৃথিবী
বাহ্! পৃথিবীটা দেখছি একেবারে নবীনা
এর নদীতে ডুব দেওয়া ভালো।
এরকম সচ্ছল নদীর ছলচ্ছলে
মনপবনের নাও ভাসিয়ে দেওয়া মন্দ নয়।
বাইসন ম্যামথের পেছনে ছুটতে ছুটতে
একদিন এরকম একটি পৃথিবীর সঙ্গে
দেখা হয়েছিল,
তার কথা মনে পড়ে।
আমি প্রতিদিন নতুন নতুন পৃথিবীর
সাক্ষাৎ পেতে ভালোবাসি।
আমি জানি অতীত মানে পুরনো নয়;
সে প্রতিদিন অষ্টাদশী রমণী, প্রতিদিন
বিবাহবার্ষিকী, প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করা।
পৃথিবী রজঃস্বলা চিরকাল,
আমি এর সঙ্গে খেলা করব এখন।
ভারতবর্ষ
আর কতকাল ঘুরব এই মুসলমানের দেশে,
………………………………………এই হিন্দুর দেশে।
নদীর সঙ্গে এসেছিলাম—
মায়ের সঙ্গে এসেছিলাম এখানে।
কোত্থেকে এসেছিলাম মনে নেই কিছু।
শুধু জানি, নদীতীরে মায়ের সঙ্গে থাকতাম।
শুধু জানি, কারা যেন একদিন নদীতে বাঁধ দিল—
আর ধীরে ধীরে মরে গেল নদী,
আমার মা মরে গেল।
আর কতকাল ঘুরব এই মুসলমানের দেশে,
………………………………………এই হিন্দুর দেশে।
আমার কাঁধে মায়ের লাশ; নদীর লাশ।
পঁচিশ বছর পর
পঁচিশ বছর পর দেখা।
পঁচিশটি বছর পৃথিবীতে ঠিকই বয়ে গেছে—
কিন্তু আমরা কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করিনি।
পঁচিশ বছরে পৃথিবী অনেক দূর এগিয়েছে—
বনের ভেতরে সভ্যতা এগিয়েছে অনেক…
জলের ভেতরে… মহাশূন্যে…
কিন্তু একটি জায়গা থেকে আমরা একটুও এগোইনি—
পঁচিশ বছর পরও আমরা খুনিই রয়ে গেলাম।
পঁচিশ বছর পরে এসেও আমাদের নিহত ভ্রুণ
চায়ের টেবিলে জলের গ্লাস ফেলে দেয়,
ভিজিয়ে দেয় দুজনকেই।
জন্ম: ২ জুন ১৯৬৮, দক্ষিণ নাগড়া, নেত্রকোণা। পেশায় সাংবাদিক। স্ত্রী সুলতানা ও কন্যা ব্রাহ্মিকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস। প্রকাশিত কবিতার বই: কৈ ও মেঘের কবিতা (১৯৯৬), ফুলচাষি মালি যাই বলো (২০০৯), বেসরকারি কবিতা (২০১২), আয়নার দিকে (২০১৫), নির্বাচিত কবিতা (২০১৬), সম্পাদিত গ্রন্থ: নব্বইয়ের কবিতা (১৯৯৯), উকিল মুন্সির গান (২০১৩)। সম্মাননা: লোক সাহিত্য পুরস্কার (২০১২)।